কক্সবাজারের উখিয়া উপজেলার পালংখালী ইউনিয়নের বালুখালী সীমান্ত এলাকায় ঘটে যাওয়া এক ভয়াবহ মাইন বিস্ফোরণ আবারও সীমান্ত নিরাপত্তার ঝুঁকিকে সামনে এনেছে। বৃহস্পতিবার (৬ আগস্ট) সকাল আনুমানিক ১০টার দিকে মিয়ানমারের অভ্যন্তরে জিরো পয়েন্ট থেকে প্রায় ৭০০ মিটার ভেতরে এই বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। এতে বদিউর রহমান (৩৮) নামে এক বাংলাদেশি নাগরিক তার ডান পা হারিয়েছেন এবং শরীরের এক পাশ মারাত্মকভাবে ক্ষতবিক্ষত হয়েছে।
ঘটনার বিবরণ ও আহত বদিউরের পরিচয়
আহত বদিউর রহমান উখিয়া উপজেলার পালংখালী ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের বালুখালী জুমের ছড়া এলাকার সোনা মিয়ার ছেলে। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ঘটনার দিন সকালে তিনি সীমান্ত পেরিয়ে মিয়ানমারের অভ্যন্তরে প্রবেশ করেন। সেখানে আগে থেকে পুঁতে রাখা একটি শক্তিশালী স্থলমাইন বা ল্যান্ডমাইনের ওপর পা পড়লে বিকট শব্দে বিস্ফোরণ ঘটে। বিস্ফোরণের তীব্রতায় তার ডান পা শরীর থেকে প্রায় বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।
বিস্ফোরণের পরপরই তাকে উদ্ধার করে উখিয়ার কুতুপালংয়ে অবস্থিত এমএসএফ (মেডিসিনস স্যানস ফ্রন্টিয়ার্স) হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তার অবস্থার অবনতি ঘটলে চিকিৎসকরা উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে দ্রুত চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে স্থানান্তরের পরামর্শ দেন। বর্তমানে তিনি সেখানে আশঙ্কাজনক অবস্থায় চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
মাছ ধরা নাকি মাদক পাচার? নেপথ্যে ‘ছোটন সিন্ডিকেট’
প্রাথমিকভাবে বদিউরের পরিবার ও ঘনিষ্ঠজনরা তিনি মাছ ধরতে গিয়ে দুর্ঘটনার শিকার হয়েছেন বলে দাবি করলেও, স্থানীয় একাধিক নির্ভরযোগ্য সূত্র ভিন্ন কথা বলছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক প্রত্যক্ষদর্শীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বদিউর রহমান মূলত স্থানীয় এক প্রভাবশালী মাদক কারবারির হয়ে কাজ করছিলেন। অভিযোগ উঠেছে, বালুখালী এলাকার কথিত মাদক গডফাদার ‘ছোটন’ নামের এক ব্যক্তির সিন্ডিকেটের ইয়াবা ও আইস সংগ্রহ করতে তিনি সীমান্ত অতিক্রম করেছিলেন।
প্রাপ্ত তথ্যমতে, বুধবার (৫ আগস্ট) সন্ধ্যায় বালুখালী বিজিবি বিওপির দক্ষিণ পাশে ‘আবাবনিয়ার প্যারা’ নামক স্থান দিয়ে বদিউর রহমান এবং আরও দুইজন রোহিঙ্গা যুবক মিয়ানমারে প্রবেশ করেন। ওই দুই রোহিঙ্গার মধ্যে একজনের নাম ভুট্টো বলে জানা গেছে, যিনি থাইংখালীর ক্যাম্প-১২-এর বাসিন্দা। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, মাইন বিস্ফোরণের পর ওই দুই রোহিঙ্গা যুবকই রক্তাক্ত অবস্থায় বদিউরকে কাঁধে করে জিরো পয়েন্ট পার করে বাংলাদেশে নিয়ে আসেন এবং পরে তারা গা ঢাকা দেন।
আরও পড়ুন: জুলাই বিপ্লবের দুই বছর: ছাত্র-জনতার সেই রক্তঝরা দিন ও নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন
বিজিবির বক্তব্য ও সতর্ক অবস্থান
সীমান্তের ৭০০ মিটার ভেতরে বিস্ফোরণ
বিজিবির উখিয়া ৬৪ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেঃ কর্নেল জহিরুল ইসলাম জি সংবাদমাধ্যমকে জানান, বিস্ফোরণটি পালংখালী ইউনিয়নের ডেকুবুনিয়া নামক এলাকায় সংঘটিত হয়েছে। এটি বালুখালী বিওপি থেকে প্রায় ১.৫ কিলোমিটার পূর্বে এবং সীমান্ত রেখা থেকে আনুমানিক ৭০০ মিটার মিয়ানমারের অভ্যন্তরে অবস্থিত। বিজিবি সদস্যরা মাইন বিস্ফোরণের বিকট শব্দ শুনতে পান এবং পরে একজন আহতের খবর নিশ্চিত হন।
তিনি আরও যোগ করেন যে, বর্তমানে মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ অস্থিতিশীল পরিস্থিতির কারণে সীমান্তে বিজিবি সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। সীমান্ত দিয়ে অবৈধ যাতায়াত এবং চোরাচালান রোধে কঠোর নজরদারি চালানো হচ্ছে। সাধারণ মানুষকে সীমান্ত এলাকায় না যাওয়ার জন্য বারবার সতর্ক করা সত্ত্বেও কিছু মানুষ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে অবৈধভাবে সীমান্ত পার হচ্ছে, যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক।
স্থানীয় জনপ্রতিনিধির উদ্বেগ
পালংখালী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এম গফুর উদ্দিন চৌধুরী এই ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, ‘সীমান্তবর্তী এলাকায় মাইন বিস্ফোরণে আমাদের একজন নাগরিক আহত হওয়ার বিষয়টি অত্যন্ত দুঃখজনক। আমি বারবার সীমান্তবাসীদের অনুরোধ করছি যাতে তারা অপ্রয়োজনে বা লোভে পড়ে বিপজ্জনক সীমান্ত এলাকায় না যান। বিশেষ করে মিয়ানমার সেনাবাহিনী ও সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো সীমান্তে ল্যান্ডমাইন পুঁতে রেখেছে বলে আমরা জানি। এ বিষয়ে প্রশাসন ও বিজিবিকে আরও কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে।’
সীমান্তে মাইন আতঙ্ক ও মাদক সিন্ডিকেটের বিস্তার
দীর্ঘদিন ধরে মিয়ানমার সীমান্ত সংলগ্ন এলাকায় জান্তা বাহিনী ও বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর সংঘাত চলছে। নিজেদের এলাকা সুরক্ষিত রাখতে তারা নিয়মিতভাবে সীমান্তে ল্যান্ডমাইন ব্যবহার করছে। এই পরিস্থিতিতে কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফ সীমান্ত দিয়ে মাদক চোরাচালান অব্যাহত থাকায় সাধারণ শ্রমিক ও দরিদ্র মানুষ সিন্ডিকেটের প্রলোভনে পড়ে প্রাণ হারাচ্ছেন বা পঙ্গুত্ব বরণ করছেন। স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, ছোটন সিন্ডিকেটের মতো যারা পর্দার আড়ালে থেকে সাধারণ মানুষকে বিপদের মুখে ঠেলে দিচ্ছে, তাদের আইনের আওতায় আনা জরুরি।

