স্মৃতিতে উজ্জ্বল দুই নক্ষত্র: আতাহার ইকবাল ও ছৈয়দ উল্লাহ
দেশের সাংবাদিকতা যখন কঠিন চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে অতিবাহিত হচ্ছে, তখন আদর্শিক সাংবাদিকতার পথপ্রদর্শক হিসেবে প্রয়াত সাংবাদিক আতাহার ইকবাল ও ছৈয়দ উল্লাহ আজাদের জীবন দর্শন অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। সম্প্রতি সাংবাদিক সংসদের উদ্যোগে আয়োজিত এক বিশেষ স্মরণসভায় বক্তারা এই অভিমত ব্যক্ত করেন। তারা বলেন, সাংবাদিকতা কেবল একটি পেশা নয়, এটি একটি ব্রত। আর সেই ব্রত পালনে এই দুই ক্ষণজন্মা সাংবাদিক যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছেন, তা বর্তমান প্রজন্মের জন্য পাথেয় হয়ে থাকবে।
রাজধানীর স্থানীয় একটি মিলনায়তনে আয়োজিত এই স্মরণসভায় সাংবাদিকতার বিভিন্ন স্তরের নেতৃবৃন্দ, রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব এবং সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। বক্তারা তাদের বক্তব্যে আতাহার ইকবাল ও ছৈয়দ উল্লাহ আজাদের সততা, নির্ভীকতা এবং সমাজ সংস্কারে তাদের কলমের শক্তির কথা স্মরণ করেন। তারা উল্লেখ করেন যে, এই দুই সাংবাদিক কখনও ক্ষমতার মোহে অন্ধ হননি, বরং সবসময় সাধারণ মানুষের অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে সোচ্চার ছিলেন।
আতাহার ইকবালের কর্মময় জীবন ও নিষ্ঠা
আতাহার ইকবাল ছিলেন একজন প্রখর ধীশক্তি সম্পন্ন সাংবাদিক। তার দীর্ঘ কর্মজীবনে তিনি বহু চাঞ্চল্যকর তথ্য এবং জনগুরুত্বপূর্ণ সংবাদ সামনে এনেছেন। স্মরণসভায় বক্তারা বলেন, আতাহার ইকবাল যখন সাংবাদিকতা শুরু করেন, তখন প্রযুক্তির এই আধিক্য ছিল না। তথ্যের জন্য তাকে মাইলের পর মাইল হাঁটতে হয়েছে, মানুষের দ্বারে দ্বারে যেতে হয়েছে। কিন্তু তিনি কখনও ক্লান্তি বোধ করেননি। সংবাদের সত্যতা যাচাইয়ে তিনি ছিলেন আপসহীন।
একজন অভিভাবক হিসেবে তিনি নতুন সাংবাদিকদের গড়ে তোলার ক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা রেখেছেন। তার অধীনে কাজ করা অনেক সাংবাদিক আজ দেশের নামী-দামী সংবাদমাধ্যমে উচ্চপদে আসীন। তারা তাদের প্রিয় মেন্টরের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। বক্তারা বলেন, আতাহার ইকবালের আদর্শ অনুসরণ করলে আজকের হলুদ সাংবাদিকতার গ্রাস থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব।
ছৈয়দ উল্লাহ আজাদের আপসহীন কলম
অন্যদিকে, ছৈয়দ উল্লাহ আজাদ ছিলেন গণমানুষের কন্ঠস্বর। তার সাংবাদিকতায় ফুটে উঠত গ্রামীণ জনপদের বঞ্চনা আর অবহেলার চিত্র। তিনি বিশ্বাস করতেন, প্রান্তিক মানুষের কথা না বলতে পারলে সাংবাদিকতা সার্থক হয় না। স্মরণসভায় উপস্থিত বক্তারা জানান, ছৈয়দ উল্লাহ আজাদ অনেক প্রতিকূলতার মধ্যেও সত্য লিখতে দ্বিধা করেননি। হুমকি বা রক্তচক্ষু তাকে কখনও দমাতে পারেনি।
তিনি সাংবাদিকতাকে পুঁজি করে ব্যক্তিগত আখের গোছানোর পক্ষপাতী ছিলেন না। বরং সারাজীবন একটি সাধারণ জীবনযাপন করে গেছেন, কিন্তু তার কলম ছিল অত্যন্ত ধারালো। তার লেখনী যেমন দুর্নীতিবাজদের কাঁপিয়ে দিত, তেমনি সাধারণ মানুষের মনে আশার আলো জাগাত। তার শূন্যতা সহজে পূরণ হওয়ার নয় বলে বক্তারা মত দেন।
সাংবাদিকতার সংকট ও বর্তমান বাস্তবতা
স্মরণসভার একটি বড় অংশ জুড়ে ছিল বর্তমান সাংবাদিকতার মান এবং নৈতিকতা নিয়ে আলোচনা। বক্তারা গভীর উদ্বেগের সাথে উল্লেখ করেন যে, বর্তমানে অনেক ক্ষেত্রে সাংবাদিকতা পেশাটি তার মৌলিক চরিত্র হারিয়ে ফেলছে। কর্পোরেট প্রভাব এবং রাজনৈতিক লেজুড়বৃত্তির কারণে সত্য আড়ালে চলে যাচ্ছে। এই সময়ে আতাহার ইকবাল ও ছৈয়দ উল্লাহ আজাদের মতো নৈতিকতাসম্পন্ন সাংবাদিকদের জীবনী পাঠ করা এবং তাদের কর্মপদ্ধতি অনুসরণ করা অপরিহার্য হয়ে পড়েছে।
বক্তারা আরও বলেন, সাংবাদিক সংসদ এই ধরণের স্মরণসভার আয়োজন করে কেবল ব্যক্তিদের সম্মান জানাচ্ছে না, বরং একটি আদর্শকে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করছে। নতুনদের উদ্দেশ্যে বক্তারা আহ্বান জানান, তারা যেন কেবল প্রযুক্তিনির্ভর সাংবাদিক না হয়ে মাঠ পর্যায়ের সাংবাদিকতায় মনোনিবেশ করেন এবং তথ্য সংগ্রহের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করেন।
স্মৃতি রক্ষার্থে উদ্যোগ গ্রহণের আহ্বান
অনুষ্ঠানে বক্তারা এই দুই গুণী সাংবাদিকের স্মৃতি রক্ষার্থে তাদের প্রকাশিত ও অপ্রকাশিত লেখাগুলো একত্রিত করে বই আকারে প্রকাশের দাবি জানান। তারা বলেন, তাদের লেখনী যদি সংরক্ষিত না হয়, তবে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এক বিশাল জ্ঞানভাণ্ডার থেকে বঞ্চিত হবে। এছাড়া সাংবাদিক সংসদের পক্ষ থেকে প্রতি বছর তাদের নামে পদক প্রবর্তনের প্রস্তাবও দেওয়া হয়, যা তরুণ সাংবাদিকদের নৈতিক সাংবাদিকতায় উৎসাহিত করবে।
উপসংহারে সাংবাদিক সংসদের সভাপতি বলেন, আতাহার ইকবাল ও ছৈয়দ উল্লাহ আজাদ আমাদের মাঝে শারীরিকভাবে নেই, কিন্তু তাদের নীতি ও আদর্শ চিরকাল বেঁচে থাকবে। তাদের প্রদর্শিত পথেই আমরা একটি সুস্থ ও সুন্দর গণমাধ্যম সংস্কৃতি গড়ে তুলতে চাই। স্মরণসভাটি অত্যন্ত ভাবগাম্ভীর্যের মধ্য দিয়ে শেষ হয় এবং উপস্থিত সকলে এই দুই সাংবাদিকের আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন।
আরও পড়ুন: তথ্যের মহাসমুদ্রে নির্ভুলতার প্রতিশ্রুতি
আতাহার ইকবাল ও ছৈয়দ উল্লাহ আজাদ কেবল নাম নয়, তারা ছিলেন সাংবাদিকতার একটি প্রতিষ্ঠান। তাদের স্মরণ করার মাধ্যমে আমরা আসলে সুস্থ সাংবাদিকতার চেতনাকেই শানিত করি। বর্তমানের প্রতিকূল সময়ে তাদের মতো ব্যক্তিত্বদের আদর্শই পারে গণমাধ্যমকে তার হৃত গৌরব ফিরিয়ে দিতে। সাংবাদিক সংসদের এই উদ্যোগ নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবি রাখে, যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সাংবাদিকদের সৎ পথে চলতে অনুপ্রেরণা জোগাবে।
সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ) – আতাহার ইকবাল ও ছৈয়দ উল্লাহ
Q1: আতাহার ইকবাল ও ছৈয়দ উল্লাহ আজাদ কে ছিলেন?
তারা দুজনই বাংলাদেশের বরেণ্য ও প্রবীণ সাংবাদিক ছিলেন, যারা তাদের নীতিবান সাংবাদিকতার জন্য পরিচিত।
Q2: স্মরণসভাটি কারা আয়োজন করেছে?
স্মরণসভাটি সাংবাদিক সংসদের উদ্যোগে আয়োজন করা হয়েছে।
Q3: বক্তারা সাংবাদিকদের প্রতি কী আহ্বান জানিয়েছেন?
বক্তারা বর্তমান প্রজন্মের সাংবাদিকদের সত্যনিষ্ঠা বজায় রাখতে এবং এই দুই গুণী সাংবাদিকের আদর্শ অনুসরণ করতে আহ্বান জানিয়েছেন।

