দীর্ঘ সাত বছরের প্রতীক্ষা আর আন্তর্জাতিক কূটনীতির টানাপোড়েনের মাঝে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে নতুন এক বার্তা সামনে এসেছে। মিয়ানমারের জান্তা সরকার বাংলাদেশ থেকে তিন লাখ রোহিঙ্গাকে ফিরিয়ে নিতে তাদের সম্মতির কথা জানিয়েছে। তবে এই ঘোষণা যতটা আশার আলো দেখাচ্ছে, তার চেয়েও বড় হয়ে দেখা দিয়েছে কার্যকারিতা নিয়ে নানাবিধ প্রশ্ন। কারণ এর আগে মিয়ানমার দুই লাখ ৮০ হাজার রোহিঙ্গাকে ফিরিয়ে নেওয়ার কথা বললেও বাস্তবে একজন রোহিঙ্গাকেও নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণভাবে রাখাইনে ফেরত পাঠানো সম্ভব হয়নি।
প্রত্যাবাসন ঘোষণার পটভূমি ও বর্তমান বাস্তবতা
সম্প্রতি বাংলাদেশ সরকারের ঊর্ধ্বতন মহলের কূটনৈতিক তৎপরতা এবং চীনের মধ্যস্থতায় রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে নতুন করে তোড়জোড় শুরু হয়েছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, মিয়ানমার ৩ লাখ রোহিঙ্গার একটি তালিকা যাচাই-বাছাই শেষে ফিরিয়ে নিতে রাজি হয়েছে। তবে এই ঘোষণার বাস্তবায়নের কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা এখনো নির্ধারিত হয়নি। রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে কাজ করা বিশ্লেষকরা মনে করছেন, মিয়ানমারের এই সম্মতি আন্তর্জাতিক চাপ কমানোর একটি কৌশল মাত্র হতে পারে।
বর্তমানে কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের শরণার্থী শিবিরগুলোতে ১২ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা অবস্থান করছে। মিয়ানমারে সামরিক অভ্যুত্থান এবং পরবর্তী সময়ে জান্তা বাহিনীর সাথে বিদ্রোহী আরাকান আর্মির চলমান যুদ্ধের কারণে রাখাইন রাজ্য এখন রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। এমন এক পরিস্থিতিতে যেখানে খোদ মিয়ানমারের নাগরিকরাই জীবন বাঁচাতে নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে ছুটছে, সেখানে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ প্রত্যাবর্তন কতটা সম্ভব, তা নিয়ে গভীর সংশয় রয়েছে।
রাখাইনের অস্থিতিশীলতা ও নতুন অনুপ্রবেশের ঝুঁকি
রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের আলোচনা যখন টেবিলে ঘুরপাক খাচ্ছে, ঠিক তখনই বাংলাদেশে নতুন করে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের ঘটনা উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। জানা গেছে, গত এক বছরে সংঘাতপূর্ণ রাখাইন থেকে জীবন বাঁচাতে আরও অন্তত ১ লাখ ২৫ হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে ঢুকে পড়েছে। সীমান্তরক্ষী বাহিনী ও স্থানীয় প্রশাসন নজরদারি বাড়ালেও অনুপ্রবেশ থামানো যাচ্ছে না। একদিকে তিন লাখ মানুষকে ফেরত পাঠানোর কথা বলা হচ্ছে, অন্যদিকে লাখো নতুন রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করছে, এই বৈপরীত্য রোহিঙ্গা সংকটের সমাধানকে আরও জটিল করে তুলছে।
আরও পড়ুন: সাংবাদিক সংসদের স্মরণসভা
সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, রাখাইনে বর্তমানে জান্তা বাহিনী ও আরাকান আর্মির মধ্যে তীব্র লড়াই চলছে। অধিকাংশ রোহিঙ্গা গ্রাম এখন জনশূন্য বা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। এই অবস্থায় কোনো ধরনের আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ ছাড়াই রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানো হলে তাদের জীবন আবারও ঝুঁকির মুখে পড়বে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে জাতিসংঘসহ বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা।
কূটনৈতিক তৎপরতা ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ভূমিকা
রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধানের জন্য আন্তর্জাতিক মহলের সক্রিয় অংশগ্রহণ অত্যন্ত জরুরি। সম্প্রতি কক্সবাজারে রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন করেছেন মার্কিন বিশেষ দূত সার্জিও গোর। তিনি শরণার্থীদের সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেন এবং বাংলাদেশের মানবিক সহায়তার প্রশংসা করেন। তবে প্রত্যাবাসনের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরির বিষয়ে তিনি মিয়ানমারের ওপর আরও চাপ প্রয়োগের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন।
চীনের মধ্যস্থতায় এর আগে দুবার প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুরুর চেষ্টা করা হলেও তা ব্যর্থ হয়। রোহিঙ্গারা তাদের নাগরিকত্ব এবং নিরাপত্তার গ্যারান্টি ছাড়া ফিরে যেতে রাজি হয়নি। এবারও একই প্রশ্ন বড় হয়ে দেখা দিয়েছে। মিয়ানমার সরকার রোহিঙ্গাদের ‘ন্যাশনাল ভেরিফিকেশন কার্ড’ বা এনভিসি দিতে চায়, যা তাদের নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি দেয় না, বরং ‘বিদেশি’ হিসেবে চিহ্নিত করে। রোহিঙ্গারা এই কার্ড গ্রহণ করতে নারাজ।
মানবপাচারকারী চক্রের তৎপরতা ও নিরাপত্তা ঝুঁকি
দীর্ঘ সময় ধরে ক্যাম্পে অলস ও ভবিষ্যৎহীন জীবন যাপন করতে গিয়ে রোহিঙ্গারা হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়ছে। এই সুযোগটিকে কাজে লাগাচ্ছে মানবপাচারকারী চক্র। ভালো জীবনের প্রলোভন দেখিয়ে ক্যাম্প থেকে অনেক রোহিঙ্গাকে ট্রলারে করে সাগরপথে মালয়েশিয়া বা ইন্দোনেশিয়ায় পাঠানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। এতে করে অসংখ্য প্রাণহানির ঘটনা ঘটছে। আবার ক্যাম্পের অভ্যন্তরে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড এবং মাদক চোরাচালানের সাথেও কিছু রোহিঙ্গা জড়িয়ে পড়ছে, যা স্থানীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বাংলাদেশ সরকার বারবার বলে আসছে, রোহিঙ্গাদের দ্রুত এবং নিরাপদ প্রত্যাবাসনই এই সমস্যার একমাত্র সমাধান। কিন্তু আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছ থেকে মিয়ানমারের ওপর যে ধরনের কঠোর পদক্ষেপ আশা করা হয়েছিল, তার ঘাটতি দৃশ্যমান। বিশেষ করে আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোর নিষ্ক্রিয়তা এবং মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিরতা এই প্রক্রিয়াকে স্থবির করে রেখেছে।
শেষ কথা ও আগামীর পথ
তিন লাখ রোহিঙ্গাকে ফিরিয়ে নেওয়ার প্রস্তাবটি কাগজে-কলমে ইতিবাচক মনে হলেও মাঠপর্যায়ে এর প্রতিফলন ঘটানো এক হিমালয়সম চ্যালেঞ্জ। রাখাইন রাজ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠা না হওয়া পর্যন্ত কোনো স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। একইসাথে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্বের বিষয়টি অমীমাংসিত রেখে তাদের ফিরিয়ে নেওয়া হলে সেটি হবে আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত। বাংলাদেশকে এখন দ্বিপাক্ষিক কূটনীতির পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বিচার আদালত (ICJ) এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে (ICC) চলা আইনি প্রক্রিয়াগুলোতে আরও জোরালো সমর্থন আদায় করতে হবে। প্রত্যাবাসন যেন কেবল লোকদেখানো প্রক্রিয়া না হয়, বরং তা যেন হয় টেকসই এবং সম্মানজনক, সেটিই এখন বিশ্ববাসীর প্রত্যাশা।

